প্রিয় প্রজন্ম || Priyo Projonmo

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যে কারনে ড্যাম কেয়ার শেখ হাসিনা

ফজলুল বারী

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ২৯ ডিসেম্বর ২০২১

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যে কারনে ড্যাম কেয়ার শেখ হাসিনা

র‍্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা। এই তালিকায় আইজিপি বেনজির আহমেদের নামও আছে। এতে বাংলাদেশের অনেকে খুশি। বিদেশে থাকা অনেকেও খুশিতে তাধিং তাধিং করছেন! বিশেষত বিএনপি-জামায়াত সহ বর্তমান সরকারের বিরোধীরা।

সংক্ষেপে যাদেরকে অ-আওয়ামী লীগ বলা হয়। বাংলাদেশ অদ্ভূত এক দেশ! নিজের নাক কেটে হলেও এর অনেক নাগরিক পরের যাত্রাভঙ্গ দেখে খুশি হয়। বাংলাদেশের কিছু পত্রিকা দেখবেন সারাদিন খুঁজে বেড়ায় বিদেশের কোন মিডিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিছু লিখেছে কিনা!

এমন কিছু পেলেই তারা তা অনুবাদ করে গুরুত্ব দিয়ে ছাপে! এমন সাংবাদিকতা পৃথিবীতে বিরল। পাশের দেশ ভারতেও পাবেননা। মমতা বন্দোপাধ্যায় আর নরেন্দ্র মোদীর মাঝে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। কিন্তু মমতা বাংলাদেশ সফরে এলে তাকে দিয়ে মোদীর বিরুদ্ধে একটা লাইন বলাতে পারবেননা।

শিখরা বিশ্বাস করে মানব জাতি দুইভাগে বিভক্ত! শিখ এবং অ-শিখ! তাদের বিশ্বাস প্রতিটি মানব শিশু শিখ হিসাবে জন্ম নেয়। যাদের চুল কেটে ফেলা হয় তারা পরে অ-শিখ হয়ে যায়! বাংলাদেশের রাজনীতিও আওয়ামী লীগ ও অ-আওয়ামী লীগ, এমন দুই ভাগে বিভক্ত।

শুধু ডানপন্থী নাবাংলাদেশের সিংহভাগ বামপন্থীরাও মনের দিক থেকে আওয়ামী লীগের ঘোর বিরোধী! অথবা এরা মনে করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে থাকা মানে সঠিক পথে থাকা! যখন দেশে বাম চরমপন্থীদের দাপট ছিল তখন তারা মনে করতো যেহেতু আওয়ামী লীগের তৃণমূল শক্ত তাই তাদের বিরুদ্ধে থাকা মানেই বুর্জোয়াদের বিপক্ষে থাকা।

বাংলাদেশের অনেক বাম এবং ডানপন্থীদের কাছে আবার আওয়ামী লীগ মানেই ভারত! ইন্ডিয়া! ভারত বিরোধিতায় অনেক বামপন্থীও মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে যাননি। দেশের ভিতরে থেকে যুদ্ধ করেছেন। আবার মাওলানা ভাসানী, মনি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো নেতারা ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা হন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কমিউনিস্ট পার্টি, মোজাফফর ন্যাপ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাকশাল গঠন করে। আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সিপিবি জিয়ার সঙ্গে খাল কাটতে গিয়েছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সিপিবির পুরানা পল্টনের অফিস ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আটদলের মিটিং পয়েন্ট।

এখন এই সিপিবি কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে জাসদ(ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টির থাকা নিয়েও দলগুলোর মধ্যে অস্বস্তি আছে। জাসদ(ইনু) ভেঙ্গে বাংলাদেশ জাসদ হলেও তারা এখনও ১৪ দলে আছে। ওয়ার্কার্স ভেঙ্গে সাইফুল হকের নেতৃত্বে ক্ষুদ্র একটি ওয়ার্কার্স পার্টি বিএনপির সঙ্গে থাকতে পেরে খুশি।

র‍্যাবের নিষেধাজ্ঞার পরপর খুশি খুশি বিএনপি অনলাইনে আর মাইকের সামনে বলার চেষ্টা করছে আরও নিষেধাজ্ঞা আসছে! নিষেধাজ্ঞা দেবে জাতিসংঘও! কথাবার্তায় মনে হবে লবিষ্ট নিয়োগ করে এসব নিষেধাজ্ঞার পিছনে তারাও জড়িত! মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের সম্পর্কও ভালো।

কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে না দেশের বিরুদ্ধে, এটা কে কাকে বোঝাবে? আমরা সবাই আমাদের দেশকে ভালোবাসি। র‍্যাব বিএনপির আমলে গঠিত। এরও আগে অপারেশন ক্লিনহার্ট নামে তারা বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড শুরু করে। তখন সবাই শুধু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত!

এরপর আওয়ামী লীগকে সাইজ করতে র‍্যাব গঠন করা হয়। তখন আওয়ামী লীগের কত নেতা-কর্মী যে এই এলিট বাহিনীর শিকার হয়েছেন। কাকতালীয় হলো ভারতেও কিন্তু এমন কালো পোশাক,মাথায় কালো রুমাল বাঁধা একটি এলিট বাহিনী আছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জাতীয় পার্টির সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের মতো র‍্যাব বাহিনীও রেখে দিয়েছে। র‍্যাবের ভুলে পা হারানো ঝালকাঠির লিমনের ঘটনা আওয়ামী লীগের একটি লজ্জার নাম। বিএনপি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে র‍্যাব গঠনের ‘কি যাতনা বিষে’।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারন হিসাবে যে ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে সেই মেয়ের আব্বু তুমি কাঁদছো কেনো” এই কান্নার অডিও শুনে কাঁদেননি, এমন পাষন্ড কম পাওয়া যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বলেছিলেন ঘটনার তদন্ত হবে। হরিদাশ পাল মানবাধিকার কমিশন জানে ঘটনা নিয়ে মামলা হয়েছে।

কিন্তু আদতে কোন মামলাই রুজু করা যায়নি। আমাদের এই সমস্যাগুলো আমরাই মেটাবো। সিনহা হত্যার ঘটনার পর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ নিয়ে আসায় টেকনাফের দাপুটে ওসি প্রদীপকে গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখিন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের নানান ইস্যুর ভিড়ে একরামুল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ আমরা এগিয়ে নিতে পারিনি। এই ব্যর্থতা আমাদের। কিন্তু এটা নিয়ে আমেরিকার কাছে বিচার দেয়া বা বিচার চাইবার কিছু নেই। সুযোগমতো বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড সবাই করে।

আমেরিকায় বন্দুক হামলা ঘটলে বন্দুকধারীকে ঘটনাস্থলে গুলি করে মারা হয়। ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানে গিয়ে কমান্ডো হামলা চালিয়ে মারতে সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে যাওয়া হয়নি। ওসামা বিন লাদেনের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেবার আদেশ কোন মার্কিন আদালত দিয়েছে?

বাংলাদেশ এমন ঘটনায় জড়ালে মার্কিনিরা কী ছেড়ে কথা বলতো? কাজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানেই কোন পবিত্র রাষ্ট্র নয় যে তার কথা মানেই বাইবেল হবে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ বিরোধী কোন সিদ্ধান্তে খুশিতে ক্যাথলিক মোর দেন পোপ হবার দরকার নেই।

আমেরিকায় র‍্যাবের কর্মকর্তাদের সম্পদ আছে কিনা জানিনা তবে বাংলাদেশে মার্কিন ব্যবসা বেশি। কেউ নিজের ব্যবসা ঝুঁকিতে ফেলতে যাবেনা। জাতিসংঘ বাহিনীতে বাংলাদেশ যে যায় তা ফ্রি যায়না বা তাদের এমনি এমনি নেয় না।

অনেক দেশ থেকে সদস্য নিতে অনেক খরচ, তাদের তুলনায় বাংলাদেশ বাহিনীর চৌকস জওয়ানদের সার্ভিস ভালো বলেই তারা বাংলাদেশ থেকে বেশী ফোর্স নেয়। সস্তায় শ্রম পাওয়া যায় বলেই বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যের এত কদর। চামাররা গার্মেন্টস পণ্যের দাম এক ডলার বাড়াতেও রাজি হয়না।

বাংলাদেশ নিয়ে দেশে-বিদেশের সব ঘটনার মতো এই ঘটনায়ও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু কন্যার দৃঢ় অবস্থানের কারনেই পদ্মা সেতু হয়েছে। নতুবা সেতুর যে অবস্থায় বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়িয়েছিল অন্য কেউ হলে কেঁদেকুটে চোখের পানি আর নাকের পানি এক করে ফেলতেন।

আর শেখ হাসিনা তাঁর স্বভাবসুলভ দৃঢ়তায় নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মানের উদ্যোগ নেয়ায় বিশ্বব্যাংক রেগেমেগে বাংলাদেশ থেকে হাত গুটিয়ে চলে যায়নি। কাজেই বিশ্বব্যাংক বলেন আর আমেরিকা বলেন তারা যে বাংলাদেশে আছে, দয়াপরবেশ হয়ে নয়।

এখানে তারা আছে তাদের ব্যবসা-অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে বলেই আছে। শেখ হাসিনার অনেক গুণ অথবা সামর্থের একটি হলো তাঁর দৃঢ়তা। বোল্ডনেস। যিনি দিনরাতের বেশিরভাগ সময় কাজের মধ্যে থাকেন। যাকে বলা যায় ফুলটাইম প্রাইম মিনিস্টার।

তাঁর বডিল্যাঙ্গুয়েজ খেয়াল করবেন। নিজের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ একজন মানুষেরই শুধু এমন শারীরিক ভাষা থাকতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার প্রধানের নানান ব্যক্তিগত দূর্বলতায় তারা আমেরিকানদের দেখলেই কাঁপতো।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিকে একবার ডঃ কামাল হোসেনকে আটক করা হয়েছিল। কামাল হোসেন মার্কিনিদের প্রিয়ভাজন ব্যক্তি এটাই সবাই জানেন। বলা হয় ১৯৯১ সালে আমেরিকা চায়নি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসুক, এরজন্যে নির্বাচনের আগে তিনি গোপনে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ান!

এরশাদ আমলে ডঃ কামালের আটকের খবব পেয়ে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এরশাদের তথা তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অফিসে ফোন করেছিলেন। হেনরি কিসিঞ্জার ফোনে বলেন শুনলাম কামাল হোসেনকে আটক করা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা এখন কেমন আছে?

কিসিঞ্জারের ওই এক ফোনেই তখন ঢাকার সিএমএ’র অফিস কাঁপতে থাকে। ডঃ কামালকেও তাৎক্ষনিক ছেড়ে দেয়া হয়। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের সহজে এপোয়েন্টমেন্টই দেননা। কারন শেখ হাসিনা তাদের স্ট্যাটাস জানেন।

তারা কথায় কথায় একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর এপোয়েন্টমেন্ট পেতে পারেননা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আমেরিকার প্রেসিডেন্টের এপোয়েন্টমেন্ট পাবেন, এটা আশাও করেননা। আর শেখ হাসিনা মনের থেকে জানেন আমেরিকা নামের এই দেশটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে।

আর এই দেশটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যার নেপথ্যে ছিল। এরজন্যে তাদের সঙ্গে কোন মাখামাখি ছাড়াই যতটা দরকার ততটা সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন শেখ হাসিনা। র‍্যাবের কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শেখ হাসিনা বোল্ডলি বলেছেন, যারা জাতির পিতার হত্যাকারীকে আশ্রয় দেয় তারা আবার গণতন্ত্রের সবক দেয়!

শেখ হাসিনার এই বোল্ডনেস, দৃঢ় উচ্চারনের কথাটি নিশ্চয় এর মাঝে মার্কিন প্রশাসনের কানে চলে গেছে। এসব খবর পাঠানোই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কাজ। এই দৃঢ়তায় কাজ হবে। দুনিয়াটা হলো গিয়ে শক্তের ভক্ত নরমের যম। মার্কিনিরা কী এখন শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করবে? ঘোড়ার ডিম করবে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা এসবের থোড়াই কেয়ার করেন। আর এটা ১৯৭৫ নয়। ২০২১। কমিশনার একরামুল হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরকে। লিমনের কাটা পায়ের মতো জাতির ললাটে এটিও একটি কালো চিহ্ন। কিন্তু এসব নিয়ে আমরা কাউকে আমাদের ওপর তাবেদারি করতে দেবোনা।