প্রিয় প্রজন্ম || Priyo Projonmo

"পলাতকা"

প্রকাশিত: ১৮:০৩, ৩০ জুন ২০২১

ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রাজ্জাক

আমার কলেজ জীবনে, এক মহানুভব ব্যক্তির বাড়িতে লজিং থাকার কারণে, বহু সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা, এক কথায় বলা চলে, বামপন্থী নেতাকর্মীর সাথে পরিচয় হয়েছিল, সেই সময়ে এই বামপন্থী রাজনীতিবিদগণ মাওবাদী বলে পরিচিত ছিলেন। সবাই ছিলেন আত্মগোপনে, সবাই ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।

আমাদের দেশের পশ্চিমাংশে, আমি বলতে চাচ্ছি বৃহত্তর যশোর জেলা ও কুষ্টিয়া জেলায়, উল্লেখিত পার্টির সদস্যদের ব্যাপক তৎপরতা ছিল।১৯৮২ সালের কোন এক সময়, ওই বাড়িতে এক ভদ্রলোক আমার সাথে থাকতে আরম্ভ করলেন, ভদ্রলোক খুবই গুরু গম্ভীর ছিলেন রাতের বেলায় বেশ কিছুক্ষণ পড়াশোনা করতেন নাম অসীম ( ছদ্ম নাম)। অসীম ভাইর একটি অভ্যাস আমার ভালো লাগতো, সে যেকোনো বই পেলেই পড়তেন। সিক্স সেভেন এর বাংলা ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক সহ এইচএসসির পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত, সবই পড়তেন। ছয় মাসের মধ্যে আমার সাথে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। যদিও অসীম ভাই আমার চেয়ে দশ বছরের বড় হবেন।

ব্যক্তিগত গভীর বন্ধুত্ব হওয়ার দরুন ভদ্রলোক কিছু কিছু কথা বলতে আরম্ভ করলেন, ঝিনাইদা যশোর চুয়াডাঙ্গা এইসব অঞ্চলের বামপন্থী আন্দোলনের বিভিন্ন কথা বলতেন।

কিভাবে তারা কমরেড সৃষ্টি করেন, তারা জনগণের জন্য কি করতে চান, মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ উচ্ছেদ করে, একটি সার্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করাই তাদের লক্ষ।

মাঝেমাঝে ভদ্রলোক আনমনা হয় কিছু কথা আমার কাছে বলে ফেলতেন। বলতেন, ভাই মাঝে মাঝে খারাপ লাগে, ইচ্ছে করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। বললাম কেন, বললেন দুই একটা প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেই খুঁজে পাই না।

বললেন আমাদের পার্টির বহু লোক রক্ত দেয় চারু মজুমদারের শেষ একটি কথার উপর ভিত্তি করে "কোন রক্তই বৃথা যায় না"

কিন্তু বাস্তবে দেখছি আমাদের পার্টির মধ্যেই সামান্য কিছু বিরোধ নিয়ে, এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের রক্ত ঝরায়। এমনকি নিজের গ্রুপের মধ্যেও কাউকে সন্দেহ হলে তার রক্ত ঝরায়, পরবর্তীতে দেখা গেল সন্দেহটা ছিল অমূলক।

নিজের কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোক বললেন আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর পরিবারের সবারপছন্দের সুন্দরী মেয়ের সাথে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের দুই বছরের মাথায় আমার প্রথম স্ত্রী মারা যান। এক বছরের মাথায় কোন এক জায়গায় এক সুন্দরী মহিলার সাথে আমার পরিচয় হয়, মহিলার সাথে পরিচয় হওয়ার পরেই,ঐ মহিলার মাধ্যমেই আমি এই বামপন্থী আন্দোলনের কর্মী হই। আমার স্ত্রীও এই বামপন্থী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী, আমরা দুজনেই আত্মগোপনে থাকি। কয়েক বছর আগে আমার স্ত্রী আমাকে কেন যেন সহ্য করতে পারছিলেন না বিভিন্ন অপবাদসহ মানসিক অত্যাচার করত। অথচ আমার স্ত্রীর প্ররোচনায়, তার গভীর ভালবাসায় আকৃষ্ট হয়ে আমি এই আন্দোলনের কর্মী হয়েছি। আমার একটি দোষ দিয়েছে আমি নাকি বাবা হতে পারবো না। এই দোষ দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে ডিভোর্স দিয়ে সে উধাও।

অসীম ভাই বললেন, যার কারণে আমি এই আন্দোলনে শরিক হলাম, সে কেমন করে কোথায় বিলীন হয়ে গেল। অসীম ভাইয়ের কথা শুনে মনে হতো প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে, দ্বিতীয় স্ত্রীকে সে খুবই মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। অসীম ভাইয়ের দীর্ঘ নিঃশ্বাসে তা বোঝা যেত।

নিজের স্ত্রীর কথা, তাদের পার্টির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা বলতে বলতে অসীম ভাই মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতেন, মাঝেমাঝে পড়াশোনার সময় আমি বলতে শুনেছি "তাহলে মুক্তি কোথায়, অনেক রক্তইতো ঝরলো আমাদের নিজেদের মধ্যে, এইসব রক্ত দেখি বৃথা যাচ্ছে"।

অসীম ভাই আফসোস করে বলতেন আমাকে এই আন্দোলনে শামিল করে আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সে এখন "পলাতকা"।

আমি দীর্ঘদিন মস্কো, লন্ডন থেকে, দেশে এসে কিছুদিন চাকরি করার পরে, আমার এক বন্ধুর বাড়িতে ঝিনাইদহ শহরে বেড়াতে গিয়েছি। এটা ছিল ২০০০ সালের দিকে। শহরের বাঘাট মিষ্টান্ন ভান্ডার ও রেস্টুরেন্টে বসে আমার বন্ধুর সাথে গল্প করছি ও মিষ্টি খাচ্ছি, নানান বিষয় নিয়ে আমার বন্ধুর সাথে কথা চলছিল। সেই সময় আমি খেয়াল করলাম, চার জন ব্যক্তি সবার হাতেই এনজিওর ব্যাগ। আমাদের সামনের টেবিলে বসল। তখন ছিল শীতের দিন গলায় মাফলার জড়ানো গায় একটি জ্যাকেট, এক ভদ্রলোক কেমন যেন চেনা চেনা কন্ঠে বলল, চারটা মোগলাই দাও পরে চার কাপ চা দিও। কন্ঠটা অতি পরিচিত পরিচিত মনে হল, আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম, মিনিটখানেক নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম, অসীম ভাই।

অসীম ভাই এর পিছনের জীবন আমি জানতাম, তাই কি করে ওনার সাথে কথা আরম্ভ করব বুঝতে পারছিলাম না। যাহোক ৫ মিনিট ধৈর্য্য ধরে থাকলাম, তারপরে আমি ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে বললাম, আমার নাম, আমি মাগুরা কলেজে পড়াশোনা করেছি পরবর্তীতে আমি মস্কোতে পড়াশোনা করেছি। ভদ্রলোক উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন প্রায় পনেরো বছর পরে তোমার সাথে দেখা। আমি এই শহরের পশ্চিম দিকে থাকি, বাসার ঠিকানা দিলেন। বললেন, তুমি সন্ধ্যার পরে অবশ্যই আমার বাসায় আসবা, তোমার সাথে আমার কথা বলতেই হবে।

আমার বন্ধুর খুবই চেনাজানা শহর ঝিনাইদহ। অসীম ভাইয়ের বাসায় গেলাম, গিয়ে দেখি মহাআয়োজন করে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

অসীম ভাই আমাদের সাথে স্ত্রী ও দুইটি মেয়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। একটি মেয়ে ক্লাস টু তে পড়ে আরেকটি মেয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ে।

অসীম ভাই বললেন ভাই অনেক কষ্ট করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি বিয়ে করেছি দেখতেই পাচ্ছো দুইটি বাচ্চা। পলাতক জীবন ছেড়ে দিয়েছি এখন এনজিওর ব্যবসা করছি।

অসীম ভাই নিজেই আমার কাছে বলল, তোমার কাছে যে গল্প করেছিলাম পিছনের কথা মনে আছে। বললাম পিছনের কোন কথা আমি ভুলিনা। অসীম ভাই বলেন, যে মহিলা আমার হৃদয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে চলে গিয়েছিল, সে এই শহরেরই একটি ক্লিনিকের নার্স, তার হাতেই আমার প্রথম কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেছে।

এই পর্বের আলাপের অসীম ভাইর শেষ কথা ছিল, কেন যে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পলাতকা ছায়া ফেলে চলে গিয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনদিনও খুঁজে পেলাম না, তবে আজ আমি খুবই সুখী।

ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রাজ্জাক।

১৫/০৬/২০

গল্পটি যে কেউ শেয়ার করতে পারেন।